কথা বলার আগে সাবধান! জিবের সংযমে লুকিয়ে আছে বেহেশতের বড় পুরস্কার


মানুষকে কষ্ট দেওয়ার জন্য সবসময় বড় কোনো কাজের প্রয়োজন হয় না—কখনো একটি মাত্র কথাই যথেষ্ট। একটি কটু মন্তব্য, একটি অপমানজনক বাক্য কিংবা কারও অজান্তে বলা একটি কথা বছরের পর বছর হৃদয়ে ক্ষত তৈরি করে রাখতে পারে।

অন্যদিকে, সুন্দর একটি কথা ভেঙে যাওয়া মনকে শান্ত করতে পারে, সম্পর্ককে আবার জোড়া লাগাতে পারে এবং একজন মানুষের পুরো দিনটিই বদলে দিতে পারে।

তাই ইসলামে মুখের কথাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণ করা শুধু উত্তম চরিত্রের পরিচয় নয়; এটি একজন মুমিনের আখিরাতের সাফল্যের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।

আজকের সময়ে জিহ্বার পরীক্ষা আরও কঠিন

আগে মানুষের কথা সীমাবদ্ধ ছিল পরিবার, প্রতিবেশী কিংবা পরিচিত মহলের মধ্যে। এখন একটি মন্তব্য মুহূর্তেই হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মতের অমিল থেকে শুরু হয় তর্ক, কটূক্তি, বিদ্রূপ, গুজব, অপমান ও ব্যক্তিগত আক্রমণ। অনেক সময় আমরা একটি মন্তব্য লিখে ভুলে যাই, কিন্তু যার উদ্দেশে বলা হয়েছে তার মনে সেই কথাটি দীর্ঘদিন থেকে যায়।

তাই শুধু মুখের কথা নয়—আমাদের টাইপ করা প্রতিটি শব্দও জিহ্বার সংযমের অংশ হিসেবে ভাবা উচিত।

একটি কথার পরিণতি কত ভয়াবহ হতে পারে?

রাসুলুল্লাহ ﷺ মুআজ ইবনে জাবাল (রা.)-কে জিহ্বা নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে বিশেষভাবে সতর্ক করেছিলেন। তিনি নিজের জিহ্বার দিকে ইঙ্গিত করে তা সংযত রাখার নির্দেশ দেন।

মুআজ (রা.) জানতে চাইলে রাসুলুল্লাহ ﷺ জিহ্বার কথার ভয়াবহ পরিণতির কথা স্মরণ করিয়ে দেন। এই শিক্ষা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মানুষের বলা কথা তুচ্ছ নয়; কথারও হিসাব রয়েছে।

কোরআনে আল্লাহ বলেন:

“মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে, তার কাছে একজন সদা প্রস্তুত প্রহরী তা লিপিবদ্ধ করে।”
— সুরা ক্বাফ, ৫০:১৮

তাহলে কথা বলার আগে আমাদের নিজেদের প্রশ্ন করা উচিত—
আমি যা বলতে যাচ্ছি, তা কি সত্য? প্রয়োজনীয়? উপকারী?

সব কথা বলা জরুরি নয়

আমরা অনেক সময় মনে করি, নিজের মতামত প্রকাশ করতেই হবে। কেউ ভুল বললে সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিতে হবে। কেউ সমালোচনা করলে পাল্টা জবাব দিতে হবে।

কিন্তু সব পরিস্থিতিতে কথা বলাই বুদ্ধিমানের কাজ নয়।

রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

“যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা নীরব থাকে।”
— সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪৭৫

এই একটি শিক্ষা দৈনন্দিন জীবনের অসংখ্য ঝামেলা থেকে আমাদের বাঁচাতে পারে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও দরকার ‘জিহ্বার সংযম’

কোনো পোস্টে উত্তেজক মন্তব্য দেখলেন—সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দেবেন না।

কারও ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে আলোচনা চলছে—অপ্রয়োজনীয়ভাবে যুক্ত হবেন না।

কোনো খবর পেলেন—যাচাই না করে শেয়ার করবেন না।

কেউ আপনাকে অপমান করল—রাগের মুহূর্তে পাল্টা অপমান করবেন না।

কারণ ডিলিট করা যায় এমন একটি কমেন্টও কারও মনে তৈরি করা আঘাত সবসময় মুছে দিতে পারে না।

বেহেশতে থাকবে কষ্টদায়ক কথার অনুপস্থিতি

দুনিয়ায় মানুষ যে কষ্টদায়ক কথাগুলো শুনে ক্লান্ত হয়, জান্নাতে সেই অশান্তির কোনো স্থান থাকবে না।

আল্লাহ বলেন:

“সেখানে তারা কোনো অসার কথা শুনবে না, মিথ্যাও নয়। এটি তোমার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে যথার্থ প্রতিদান।”
— সুরা নাবা, ৭৮:৩৫–৩৬

ভাবুন, এমন একটি স্থান যেখানে নেই অপমান, নেই কটু কথা, নেই মিথ্যা, নেই অশান্তি—শুধু শান্তি ও সম্মান।

এই কারণেই দুনিয়াতেই নিজের কথাকে পরিশুদ্ধ করার অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি।

আজ থেকেই ৫টি অভ্যাস করুন

১. রাগের সময় চুপ থাকুন
রাগের মুহূর্তে বলা কথা পরে আফসোসের কারণ হতে পারে।

২. গুজব যাচাই ছাড়া ছড়াবেন না
একটি ভুল তথ্য কারও সম্মান, পরিবার কিংবা জীবনে বড় ক্ষতি করতে পারে।

৩. গিবত থেকে নিজেকে দূরে রাখুন
কেউ অনুপস্থিত থাকলে তার সম্পর্কে এমন কথা বলা থেকে বিরত থাকুন, যা সে শুনলে কষ্ট পাবে।

৪. কমেন্ট করার আগে কয়েক সেকেন্ড ভাবুন
নিজেকে জিজ্ঞেস করুন—এই কথাটি কি সত্যিই প্রয়োজন?

৫. প্রতিদিন কিছু সময় নীরব থাকুন
অপ্রয়োজনীয় কথার ভিড় কমলে নিজের ভেতরের অস্থিরতাও অনেকটা কমে আসতে পারে।

শেষ কথা

আমাদের জিহ্বা ছোট, কিন্তু এর প্রভাব অনেক বড়।

একটি কথা কাউকে ভেঙে দিতে পারে, আবার একটি ভালো কথা কাউকে নতুন করে বাঁচার সাহসও দিতে পারে।

তাই কথা বলার আগে একটু থামুন।
যা সত্য নয়—বলবেন না।
যা প্রয়োজন নয়—বলবেন না।
যা কাউকে অকারণে কষ্ট দেবে—বলবেন না।

মনে রাখুন, নীরবতা সবসময় দুর্বলতা নয়; অনেক সময় নীরব থাকাটাই আত্মসংযমের সবচেয়ে সুন্দর প্রকাশ।

আল্লাহ আমাদের জিহ্বাকে মিথ্যা, গিবত, অপবাদ, কটু কথা ও অপ্রয়োজনীয় বাক্য থেকে হেফাজত করুন এবং সুন্দর, সত্য ও উপকারী কথা বলার তাওফিক দান করুন। আমিন। 

Sriti

Post a Comment

Previous Post Next Post

Popular Items